‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’, তকমাবাজির রাজনীতি এবং ইতিহাসের শিক্ষা

যে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা ঘটনা সংশ্লিষ্ট টার্ম/শব্দ প্রায়শই রাজনৈতিক ময়দানে ট্যাগ বা তকমা হিসাবে এস্তেমাল হতে পারে। তকমাবাজির মধ্য দিয়ে সেই টার্ম আদি অর্থ হারিয়ে এক নতুন সুরত নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। এমনকি, সেই তকমা রাজনৈতিক রেটরিক হিসাবে নির্দিষ্ট ইতিহাস থেকে বিচ্যুত হয়ে একেবারে নতুন, কখনো পরিস্থিতিভেদে, ভিন্ন অর্থ নিয়ে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। সেই তকমাবাজি রাজনৈতিক জটিল আবর্তের মধ্যে পড়ে প্রাণঘাতী রাজনীতির উপলক্ষ্য ও নিপীড়নমূলক হয়ে উঠলেও আমাদের অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কখন এবং কীভাবে একটা শব্দ/ টার্ম তার নির্দিষ্ট ইতিহাস থেকে বের হয়ে ‘তকমা’তে পরিণত হয়, তা বোঝার জন্য আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ টার্মকে ধরে আলাপ আগ বাড়াতে পারি।

ঐতিহাসিকভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ শব্দটার একটা নির্দিষ্ট অর্থ আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক লড়াইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল যে সকল রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী বা ব্যক্তি তারা ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’; বা তাদের কাজকেই- অর্থাৎ, জনগণের লড়াইয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে উল্টো রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে ক্রিয়াশীল থাকা বা সম্মতি তৈরি করা – ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিরোধী বলা হয়। ঐতিহাসিকভাবে এটা একেবারে কংক্রিট সংজ্ঞা।

কিন্তু, আওয়ামীলীগ যেভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বলতো বা রাজনৈতিক ময়দানে এই শব্দের যেমন এস্তেমাল করা হতো, সেটা আসলে সেই নির্দিষ্ট জিনিস না, বরঞ্চ তাদের রেটরিকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ছিল একটা আমব্রেলা টার্ম।

মুক্তিযুদ্ধের পর পহেলা দশকেই আমরা দেখি, যে রাজনৈতিক সহিংসতা হচ্ছে, যে পরিমাণ ব্যক্তি ক্যু বা রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন তারা প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের একেবারে রণাঙ্গনের যোদ্ধা। সবাই বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করেছেন, বা যুদ্ধের নানা ফন্টে অংশ নিয়েছেন। তাদের একটা বড় অংশই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তারা কেউই ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ নয়।

মুক্তিযুদ্ধে সবাই যোগ দিয়েছিলেন নানান মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। তাদের সবার একটা ইমিডিয়েট সাধারণ উদ্দেশ্য (গোল) ছিল। যার যার বুদ্ধিবৃত্তিক, মতাদর্শিক, রাজনৈতিক এবং পেশাগত অবস্থান থেকে একেক একেক মুহূর্তে একেক জন যোগ দিয়েছিলেন। যুক্ত হওয়ার প্রেরণাও ছিল একেকজনের একেকরকম। তাদের কারণ এবং তাদের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এই ভিন্নতা মোটেও নেতিবাচক প্রপঞ্চ নয়, বরঞ্চ এই ভিন্নতা আদতে বিচিত্রতা, এটাই জনগণের সামূহিক অংশের যুক্ততার স্মারক। আমাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে প্রায়শই এই ভিন্নতা ও মতভেদকে বাঙালির রাজনৈতিক ‘দোষ’ আকারে চিত্রিত হয়েছে। ভিন্নতা ও মতভেদকে ‘দোষ’ আকারে দেখার মধ্যে একধরনের ‘একদলীয়’ শাসনের বাসনা কাজ করে; ঐক্যের নাম করে যেন সকল ‘বৈচিত্র্য’কে উধাও করে দেওয়ার বাসনা। ফলে, যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে ফিরে আসার পর যার যার রাজনীতি ও আদর্শের ফারাক স্পষ্ট ও সক্রিয় হওয়া শুরু করে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এই বিভেদ ‘বিচিত্রতা’ আকারে হাজির না হয়ে বিদ্বেষে রূপান্তরিত হয়ে গেলে ভয়াবহ রক্তারক্তির ইতিহাসের জন্ম নিলো। পুরো দশকজুড়ে এক মুক্তিযোদ্ধার হাতে আরেক মুক্তিযোদ্ধার নিহত হওয়ার নজির দেখলাম। সেই রক্তারক্তির রেশ আমরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।

কিন্তু, এই যে রক্তারক্তির সকল পক্ষে যারা আছেন, সবাই ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থী’। কিন্তু আওয়ামীলীগ ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বলে যে আমব্রেলা টার্ম ব্যবহার করা শুরু করে, সেটা ছিল একেবারেই নির্মিত বা কনস্ট্রাকটেড। এটি আদি ও নির্দিষ্ট অর্থ থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে ইচ্ছামতো ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বলার ফুসরত এনে দেয়। অর্থাৎ, এটাকে ‘তকমা’ হিসেবে এস্তেমালের সুযোগ করে দেয়। এই আমব্রেলা টার্মের ব্যাকরণ অনুযায়ী দেখা গেলো, যারা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করছেন তাদেরকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বলা হচ্ছে। কিন্তু, ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, আদতে তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা।

এখন মুক্তিযুদ্ধের যদি কোনো নির্দিষ্ট চেতনা থেকেই থাকে, বা যা-ই ধরেন না কেন, তার বরখেলাপ একেবারে বাহাত্তর থেকেই দেখা যাবে। কেন রক্ষীবাহিনী গঠন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী না? কেন চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী না? কেন সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী না? এমন অজস্র প্রশ্ন তোলা যায়।

কিন্তু, আওয়ামীলীগ যেভাবে এটাকে আমব্রেলা টার্ম হিসাবে ব্যবহার করেছে, তাতে এর কোনো কিছুই ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ না, কিন্তু পচাত্তরের পনের-আগস্ট এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’। অর্থাৎ, ক্রমাগত নতুন নতুন জিনিস এই আমব্রেলা টার্মের ভেতরে গুজে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। গত পনের বছরের কাজকেও অবলীলায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে রায় দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই আমব্রেলা টার্ম থেকে আওয়ামীলীগ একাই সুবিধা ভোগ করে গিয়েছে। কারণ এই ছাতার নিচে নিজের মনমতন বা নিজের মতাদর্শ অনুযায়ী সব গুজে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

এটাই আসলে যেকোনো ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট বর্গকে ‘আমব্রেলা টার্ম’ হিসাবে ব্যবহারের বিপদ। এটা দিয়েই সেই নির্দিষ্ট বর্গ তার আদি অর্থ থেকে সরে এসে ‘তকমা’তে পরিণত হয় এবং তকমাবাজির রাস্তা প্রশস্ত হয়। ‘রাজাকার’ শব্দের ক্ষেত্রেও একদম এটা ঘটেছিল। রাজাকার বলতে যে নির্দিষ্ট বাহিনী ছিল, যারা কিনা একাত্তরে নানাবিধ অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে এটাকে ‘আমব্রেলা টার্মে’ পরিণত করা হয়েছিল; যার ভেতরে নিত্যনতুন ব্যক্তিকে ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক ইতিহাসবিদরাও অবলীলায় ‘রাজাকার’ শব্দকে আমব্রেলা টার্ম হিসাবে ব্যবহার করেছেন। একাত্তর সালে যে বা যারা শান্তিবাহিনী ও আলবদরের সাথে যুক্ত ছিল, তাদেরকেও ‘রাজাকার’ বলেই সম্বোধন করার রেওয়াজ শুরু হলো। ধীরে ধীরে দেখা গেলো, যখনই কেউ আওয়ামী-রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গেল, অথবা আওয়ামী-বয়ানের বাইরে কথা বলতে গেলো, তখনই তাকে ‘রাজাকার’ বলে উপাধি দেওয়া হলো। এর চূড়ান্ত অর্থ-বিচ্যুতি এবং বিপত্তি দেখা গেলো চব্বিশের জুলাই মাসে এসে। 

আমরা যে এখন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধ-পক্ষ দিয়ে যা বুঝি, তার আসলে আওয়ামীলীগের এই ফ্রেমওয়ার্কেই বুঝি। এমনকি, ইউটিউবার ইলিয়াস হোসেন যখন শেখ মুজিবের একজন হত্যাকারীকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি মুক্তিযুদ্ধ করছেন বলে অনুতপ্ত বোধ করেন কিনা, তখন বোঝা যায়, ইলিয়াসও আওয়ামীলীগের মতোই ভাবছেন : যারা মুজিবকে হত্যা করেছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। মুজিবকে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তখন সেটারও জাস্টিফিকেশন করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বরাত দিয়া।

একাত্তর পরবর্তী পহেলা দশকে প্রায় সকল পক্ষই তাদের কাজকে জাস্টিফাই করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা’ দিয়ে। অর্থাৎ, সেই দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এতই ‘সর্বজনীন’ হয়ে গিয়েছিল যে, প্রবল-বিরোধী ও পরষ্পরবিরোধী পক্ষও তাদের কাজকে একই ‘চেতনা’র বলে দাবি করতে পারতো। অন্যদিকে বলতে গেলে, এটা একেবারে অর্থহীন হয়ে উঠেছিল। এই অর্থহীনতা আরও প্রকট হয়েছিল যখন এই ‘চেতনা’ তার অর্থশূন্যতা নিয়ে আইনের ভেতরে ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের আরেক হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের আইনে যখন ‘চেতনা’ যখন অন্তর্ভূক্ত হয়, তখন তার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ থাকে না, এটা এমন এক ‘তকমা’তে পরিণত হয় যা দিয়ে আওয়ামীলীগ সবকিছুকে তার আওতায় নিয়ে আসতে পারতো; অথবা তার বয়ানের বাইরের সবকিছুতে ‘চেতনা’ বহির্ভূত বলে রায় দিতে পারতো। 

ফলে, ইলিয়াস যখন তার প্রশ্নের উত্তর শুনেছিলেন, তিনি [শেখ মুজিবের সেই হত্যাকারী] মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বলে গর্ববোধ করেন, তখন ইলিয়াস প্রায় চুপসে গেছিলেন। বাংলাদেশে যারা একাত্তরে দলীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন, তারা প্রায়শই মুজিব হত্যাকারীদের কথা শুনে, বা তাদের প্রসঙ্গ এলে, বেশ আপ্লুত হয়ে পড়েন, বা খুশিতে উদ্বেলিত হন। কিন্তু, এতে আসলে তাদের খুশির কারণ নেই। খেয়াল করে দেখবেন, মুজিবের হত্যাকারী কেউই আসলে ঐতিহাসিকভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ নয়, যে অর্থে জামায়াত-ই- ইসলাম বা নেজাম-ই ইসলাম ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’। বরঞ্চ, সেই হত্যাকারীদের সবাই আসলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। এটা ঐতিহাসিক সত্য। মুজিব হত্যাকারীরা ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ হয়ে উঠেছেন আওয়ামী বয়ানের ভেতর দিয়ে।  

চব্বিশে এসে এই আলোচনা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। চব্বিশেও বহুত গোষ্ঠী জড়ো হয়েছিল, একেক জনের একেক অবস্থান থেকে। একটা কমন ‘না’ এর ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছিল। কেউ শেখ হাসিনাকে চায় না। এখন হাসিনার পলায়নের পর সবার রাজনীতি ও কৌশল ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-বিরোধী একেবারে নির্দিষ্টভাবেই ‘আওয়ামীলীগ’। এখন যদি এই ‘গণঅভ্যুত্থানবিরোধী’কে আমব্রেলা টার্ম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়, তাহলে একাত্তরের অভিজ্ঞতা বলছে, এটা তকমাবাজির রাজনীতির ব্যতীত আর কিছুই উপহার দিবে না। এর আলামত ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে। কথার পিঠে কথা না এসে ‘তকমা’ এসে হাজির হচ্ছে।

যখন জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হয়, তখন নিশ্চয় মতাদর্শিক ঐক্যের কথা বলা হয় না। জাতীয় ঐক্যের মানে পলিসিগত ঐক্য। মতাদর্শিক বিভাজনকে মন্দ বলে ঠাহর করা উচিৎ হবে না। কিন্তু এই বিভাজন যেন রাষ্ট্রজন অথবা নাগরিক হিসাবে ন্যূনতম পলিসিগত ঐক্যের জায়গা নষ্ট না করে, সেদিকেই খেয়াল রাখা দরকার। আমার মতাদর্শিক বিভাজন যেন রাষ্ট্রজনের অধিকার হরণের উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে না পারে, এই ধরনের বোঝাপড়াকেই আমি জাতীয় ঐক্য বলে মনে করি। পার্লামেন্ট, বিচারবিভাগ সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে কী ধরনের সংস্কার হলে সকল মতাদর্শের রাষ্ট্রজন সমান অধিকার ভোগ করবেন, সেই বিষয়ে ঐক্যমতকেই আমি জাতীয় ঐক্য মনে করি।

যদিও বলা হয়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি, এটাই নাকি ইতিহাসের শিক্ষা। আমাদের সেই চক্র থেকে বের হতে হবে। আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতেই হবে যেন, ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *