জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার এবং হাসিনার ‘ফাঁসি’র রায়
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রথমত, যারা তাদের স্বজন হারিয়েছেন, ভাই-বোন-সন্তান হারিয়েছেন, এই রায় তাদের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে না এনে দিলেও তাদের দুঃখ ও ক্ষোভের কিছুটা লাঘব ঘটাবে। এমন ম্যাসিভ স্কেলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের হোতার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে, এটা অনুমেয় ছিল। দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও এমন রায়ের আশংকা/প্রত্যাশা করছিলেন। (দেখুন লেখা: ১, ২)
দ্বিতীয়ত, আমার জন্য এই রায় এক ধরনের টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে। আমি দীর্ঘদিন যাবত শাস্তি হিসাবে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা ফাঁসির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি। এর আগে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যখন করা হয়, তখনও এর বিরুদ্ধে ছিলাম। আদতে শাহবাগের অভিজ্ঞতা থেকে ‘ফাঁসি’/শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আমার অবস্থান তৈরি হয়েছিল। ফলে, একদিকে আমি খুশি সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে, আবার আমি ফাঁসির বিরুদ্ধে অবস্থান এখনও অনড়। অভ্যুত্থানের পর যখন আইনের সংশোধনের আলাপ উঠেছিল, তখন আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এবং সবার সমর্থনে হাসিনার মত বিগফিশের বিচার করতে চাই, তাহলে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাসি/মৃত্যুদণ্ডকে বাদ দেওয়া উচিত। শাহবাগের আমলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রধানত দুটো দিকে আপত্তি জানাতো: স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ‘ফাঁসি’ নিয়ে। ফলে, নৈতিক ও কৌশলগত জায়গা থেকেও ফাঁসির বিরুদ্ধে আমি অবস্থান নিয়েছিলাম। [ইতিমধ্যে যেসকল প্রতিক্রিয়া হয়েছে সেগুলো দেখতে পারেন: ডেভিড বার্গম্যান, ইউনাইটেড ন্যাশন হিউম্যান রাইটস, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল]
এই মুহুর্তে বাংলাদেশের আদালতের পক্ষে ফাঁসির [যেহেতু সর্বোচ্চ শাস্তি] নিচে কোনো কিছু দেওয়া সম্ভব ছিল না। জনমত যেভাবে ‘ফাঁসি’ চাচ্ছেন, এবং এই বিষয়ে বাংলাদেশের সক্রিয় রাজনৈতিক পরিসরে মোটামুটি ঐক্যমত রয়েছে, তাতে ফাঁসির নিচে কিছু দেয়া অসম্ভব ছিল বলে মনে হয়।
তৃতীয়ত, যেহেতু মূল আসামী দুইজনই পলাতক, এবং তাদেরকে দেশে এনে রায় বাস্তবায়ন করা আদতে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্কের সাথে জড়িত, সেহেতু অনুমান করা যায়, এই রায়ের বাস্তবায়ন হয়তোবা সম্ভব হবে না। ভারত হাসিনাকে হস্তান্তর করবে না। অন্যদিকে, ‘ফাঁসি’র রায়ের কারণে অন্যকোন শক্তি বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোনো চাপও এখানে দেয়া যাবে না। কেউ কেউ আশঙ্কা করতেছেন, ফাঁসির রায় দেখায়ে উল্টো এসাইলাম নিতেও পারে।
ফলে এই রায় যতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, তাঁর চেয়ে বেশি এর গুরুত্ব আসলে সিম্বোলিক। প্রতীকী অর্থে এই রায়ের শক্তিশালী প্রভাব থাকবে। হাসিনার রাজনীতি আসলে ৫ আগস্টের পরে মারা গিয়েছিল। এই রায় তার সাজা বাস্তবায়ন না করতে পারলেও তার রাজনীতিকে কবর দিয়ে দিলো। এখন পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে, এই সিম্বোলিক ‘কবর’ কী ধীরে ধীরে ধুলোয় মিশে যাবে, নাকি একে কেন্দ্র করে আরো কোনো মাজার গড়ে উঠবে?
চতুর্থত, যে ট্র্যাইব্যুনালে হাসিনা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছিল, সেই ট্রাইব্যুনালে এবার হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হলো। ট্রাইব্যুনালের সরকারপক্ষীয় আইনজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে খেয়াল রাখলে আকলমানদের জন্য অনেক ইশারা এখানে আছে। আপাতত জরুরি হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে যারা খেয়াল রাখেন, তারা জানেন, এখানে খুব দ্রুত – মাত্র দশ/পনের বছরের মাথায় – সকল হিসাবনিকাশ পালটে যায়। দ্রুত রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন/সমঝোতা/বন্দোবস্ত ভেঙ্গে পড়ে। আজকে যে সাকা চৌধুরীর কথা উড়ে বেড়াচ্ছে, যদি ট্রাইব্যুনাল থাকে, তাহলে সেখানে হাসিনারও ফাঁসি হবে। এই কথাগুলোকে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশেষ প্রবণতার দিক থেকে পাঠ করতে পারি।
জুলাই হত্যাযজ্ঞের দেড় বছরের মাথায় হাসিনাসহ মূল হোতা দুই/তিনজনের রায় বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। শহিদদের স্মজনদের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য দেখে নিজেরও চোখ ভিজে উঠছিল। একদিকে হাসিনার রায়ের আনন্দ, অন্যদিকে ফাঁসি নিয়ে নিজের অবস্থান আমার মধ্যে এক যে টানাপোড়েন তৈরি করেছে, সেটা মাথায় নিয়েই বলতে পারি, বাংলাদেশে গত দেড় বছরে প্রায় সকল রাজনৈতিক পরিসর ‘বিচার’ প্রশ্নে একাট্টা ছিল। এটা আসলে সেই একাট্টার ফসলও। জুডিয়াসিয়াল বিচার আমাদের ‘ইনসাফ’ কায়েমের জন্য অত্যাবশ্যক, তবে আমাদের দৃষ্টি আরও প্রসারিত করতে হবে। আমাদের ইনসাফ চাওয়ার ভাষার মধ্যে এখনো বেইনসাফি ঘাপটি মেরে বসে আছে। আজকে আদালতের সামনে মঞ্চ-২৪ এর ব্যানারের ভাষাকে এভাবে পাঠ করা যায়। [নিচের ছবিটা দেখুন]

